আমাদের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কচি-কাঁচাদের ভিড় আছে। ভ্রমণের পূর্বে তাদের চিন্তাটাই মাথায় প্রথমে আসে, বিশেষ করে তা যদি হয় পাহাড়ি এলাকায় বেড়ানো। বাবা – মা রা এই ক্ষেত্রে দোটানায় পরে যায়। এর প্রধান কারণ হলো বাচ্চারা তাদের শারীরিক কষ্টের কথা আমাদের সামনে সঠিক ভাবে ব্যাক্ত করতে পারেনা, অনেকেতো আবার চুপ করে থাকে, ফলে বোঝা দায় হয় যে সমস্যাটা কোথায়, সমাধান তো পরের কথা। প্রথমে আমাদের বাচ্চাদের বয়স দেখে বিভাজন টা বুঝতে হবে, বিভাজন-টা অনেকটা নিম্নরূপ…
| New-born | 0 – 1 month of age |
| Infant | 1 – 23 months of age |
| Preschool child | 2 – 5 years of age |
| Child | 6 – 12 years of age |
| Adolescent | 13 – 18 years of age |
৩ বছরের নিচে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তারা পরিবর্তিত যে কোনো পরিবেশে বেড়াতে গেলেই তাদের ঘুম, ক্ষিদে, মুড্- এর মধ্যে একটা আমূল পরিবর্তন চলে আসে। ৩ থেকে ৮ বছরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এবং যাদের শোনা – বলার অসুবিধা তাদের ক্ষেত্রে শারীরিক কষ্ট ব্যাক্ত করা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আর ৮ বছর ওপরের বাচ্চাদের সঙ্গে প্রাপ্ত বয়স্কদের শারীরিক অবস্থা কে সম-মানের ধরা হয়। ৪০০০ মিটার (১৩১২৩ ফুট) ওপরে প্রি-স্কুলের কম বয়সী বাচ্চাদের নিয়ে রাত্রিযাপন না করাই ভালো। নাহলে রক্তে কার্বনডাই-অক্সাইড এর মাত্রা কমে গিয়ে স্বাশ-কষ্ট হবে।
সাধারণতঃ অবিভাবকরা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হয় সেগুলি হলো বায়ুর চাপ জনিত কান ব্যাথা, যেটি নানা কারণে হতে পারে। যেমন : রোপওয়ে অথবা গাড়ি করে স্বল্প সময়ে দীর্ঘ উচ্চতায় উঠে যাওয়া। যে সমস্ত বাচ্চাদের আগে থেকেই সর্দি-কাশি, টনসিল এর সমস্যা থাকে তাদের এই কান ব্যাথার সমস্যা বেশি দেখা দেয়। শারীরিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ বাচ্চাদেরকেই High Altitude এ নিয়ে যাওয়া উচিত। আপনারা বাচ্চাদের কে বলতে পারেন মাঝে মাঝে নিজেদের নাকে, ঠোঁটে চিমটি কাটতে। যাতে সহজে নাক ও ঠোঁট অবশ না হয়ে যায়। আর নাক দিয়ে রক্ত পরাটা অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। শুষ্ক অঞ্চলের জন্য এটা হওয়া স্বাভাবিক। নাক দিয়ে জল টানলেই এটা সেরে যায়।
এবারে আসা যাক কি কি সমস্যার সম্মুখীন হলে আপনারা কি কি ব্যাবস্থা গ্রহণ করবেন…
AMS / HAPE / HACE সমস্যা এরাবার ক্ষেত্রে আপনারা ধীরে ধীরে আরোহনের ব্যাবস্থা করুন। প্রতি ১০০০ মিটার অন্তর আপনারা বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করুন।
সবসময় আপনারা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে একটা আপত্কালীন পরিকল্পনা করে রাখবেন। যেমন ইনহেলার, কর্পূর, মধু, নাকের ড্রপ, গরম জল ইত্যাদি।
ভ্রমণের পূর্বে বাচ্চাদের কে নানারকম শারীরিক কষ্ট বোঝাবার ভঙ্গিমা অনুশীলন করিয়ে রাখবেন এবং পাশাপাশি কি কি ধরণের অসুবিধা হতে পারে তাদের কে জানিয়ে রাখুন, যাতে এমন পরিস্থিতি আসলে তারা Thumbs-up ও Thumbs-Down দেখিয়ে নিজেদের অবস্থা বোঝাতে পারে।
পাহাড়ে ভ্রমণের সময় আপনারা যাত্রা পথে বাচ্চাদের কে নানারকম প্রশ্ন করতে পারেন। যেমনঃ
- ১ – মাথা ব্যাথ্যা করছে?
- ২ – ক্ষিদে পেয়েছে?
- ৩ – শরীর ক্লান্ত লাগছে?
- ৪ – ঘুম পেয়েছে? রাতে কেমন ঘুম হয়েছিল?
- ৫ – কান ব্যাথা করছে? আমার কথা ঠিকঠাক শুনতে পারছো?
- ৬ – নাক কি বন্ধ হয়ে আছে?
এই সমস্ত প্রশ্নের আশা মূলক উত্তর না পেলে আপনারা ব্যবস্থা নিতে শুরু করবেন। পারলে গাছ-পালা আছে এমন জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে পরবেন।
- শিশু ও বাচ্চারা ঠান্ডার কারণে অনেকরকম বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে পরে। শরীর যত পরিমান তাপ উৎপাদন করে তার চেয়ে বেশি পরিমান তাপ শরীর থেকে বেরিয়ে গেলে শরীর হঠাৎ করে খুব ঠান্ডা হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বাচ্চাদের মাথায় টুপি পরাটা অত্যন্ত আবশ্যিক। কারণ তা বাচ্চাদের শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করে কমতে বাধা দেয়।
- পরিপূর্ণ সুস্থ বাচ্চাদের নাক এবং কান খোলা রেখে মাথায় টুপি ও গলায় মাফলার দিয়ে রাখবেন।
- বরফে সূর্যের প্রতিফলন এবং High Altitude এ সূর্যের Ultra-Violet ray বাচ্চাদের ত্বককে পুড়িয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে বাচ্চাদের কে SPF-৩০ যুক্ত লোশন ও ফুলহাতা জামা ব্যবহার করা উচিৎ।
- বরফে সূর্যের প্রতিফলন থেকে চোখ অন্ধও হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বাচ্চাদেরকে গগলস পরাবেন।
- High Altitude ভ্রমণে যদি কোনো বাচ্চা Dehydration এ সমস্যায় পরে, তাহলে ORS / Glucan-D খাওয়াবেন।
- ৮০০০ ফুটের ওপরে ভ্রমণকালে বাচ্চাদের বেশি ছোটা-ছুটি করতে দেবেননা। ভ্রমণকালে পপকর্ন / চকোলেট / চুইংগাম এবং ১০/১৫ মিনিট অন্তর ২/৩ ঢোক করে জল খাওয়াবেন। তাতে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ হবে ও সমতা বজায় থাকবে। জলের ঠান্ডা ভাব কাটিয়ে সাধারণ জল খাওয়াবেন, উষ্ণ গরম জল না খাওয়ালেই ভালো।
- পাহাড়ে ভ্রমণকালে বাচ্চাদের একদমই বেশি করে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না, আবার পেট খালি-ও রাখবেন না।
- ৮০০০ ফুটের ওপরে ভ্রমণকালে যদি কোনো বাচ্চা “High Altitude Sickness” এর সমস্যায় পরে, চেষ্টা করবেন তাদের সাথে সুন্দর ভাবে কথা বলে সমস্যা জানার। যদি স্বাসকষ্ট হয় তবেই ইনহেলার ১/২ বার ব্যবহার করবেন।
- অতিরিক্ত ঠান্ডা জায়গাতে লিকার চা / ব্ল্যাক কফি খাওয়াবেন, তাতে বাচ্চাদের শরীরের স্নায়ু গুলি সতেজ থাকে এবং শরীরকে হালকা গরম করার জন্য Half-চামচ মধু অথবা স্যুপ খাওয়াবেন।
একটা কথা মনে রাখবেন, High Altitude ভ্রমণে শিশু / বাচ্ছারা অসুস্ততা বোধ করা কালীন তাদের সামনে প্যানিকগ্রস্থ অথবা কান্নাকাটি করবেন না। বাচ্চারা মা / বাবা কে প্যানিকগ্রস্থ অথবা কান্নাকাটি করতে দেখলে তারা আরো ভয় পেয়ে যায়, তাতে ওদের সমস্যার কথা সঠিক ভাবে জানতে পারবেন না। একদম সাধারণ ভাবে ওদের সাথে ব্যবহার করে অসুবিধা জানার চেষ্টা করুন এবং মনে সাহস দিন। সাধারণত ৩ বছরের ঊর্ধ্যে যে সমস্ত বাচ্চারা খুব দুরন্ত, তারা ৫০০০ ফুট থেকে ১২০০০ ফুট উচ্চতার মধ্যে যে কোনো Altitude -এ একজন প্রাপ্ত-বয়স্কের থেকেও খুব তাড়াতাড়ি Acclimatization করতে পারে, কারণ তাদের Cardiovascular প্রাপ্ত-বয়স্কদের থেকেও ভালো। তাই বলে শিশু / বাচ্চাদের নিয়ে খুব হেক্টিক জার্নি / হেক্টিক ভ্রমণ পরিকল্পনা না করাই ভালো। ভ্রমণকালে আমাদের কচি-কাঁচারা যদি ভালোভাবে প্রকৃতিকে উপভোগই না করতে পারে তাহলে আমাদের সম্পূর্ণ যাত্রাটাই মাঠে মারা যাবে। তাই সুস্থ থাকুন, সুস্থ রাখুন এবং প্রাণ ভোরে সবাইকে নিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করুন।
যারা দিল্লী থেকে বিমানে লেহ যাবেন এবং মানালি থেকে স্পিতি ভ্যালি যাবেন, তাদের উদ্দ্যেশে একটাই কথা বলতে চাই, এই রুটে হাথে ১টা দিন Altitude acclimatization এর জন্য ধরে রাখবেন, সেদিন কোথাও ঘোরা-ঘুরি না করে ভালো করে বিশ্রাম নেবেন, তা না হলে আপনার বিপদ আপনি নিজেই ডেকে আনবেন।
– Utpal Datta (Pal Datta)
*Image Source Internet

